মানসিক ধ্যানধারণার ছকের ভূমিকা
মানসিক ধ্যানধারণার ছক

মানসিক ধ্যানধারণার ছকের ভূমিকা

আব্রাহাম মাসলো বলেন, “আপনার কাছে যদি কেবল একটি হাতুড়ি থাকে, তবে প্রতিটি সমস্যাকেই পেরেক হিসাবে দেখবেন।”

বিবর্তন মানুষের কৌতূহলের পুরস্কার দিয়েছে। প্রতিনিয়ত নিরলস অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে আমাদের করেছে বাধ্য। আমাদের অন্বেষণের পথ ধরে আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি তা সংগঠিত করার জন্য, আমরা এটাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আরও কম বা বেশি নানা প্রাসঙ্গিক অংশে ভাগ করি।

বর্তমানে জ্ঞান এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে একে নানা শাখা-উপশাখায় ভাগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এর দ্বারাই বিভিন্ন উপশাখা এবং উপ-উপশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই শ্রেণীবিভাগ ছাড়া আমরা এতটা অগ্রগতি করতে পারতাম, তা ভাবাই কঠিন। শ্রেণীবিভাগের কারণে আমরা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা পেয়েছি এবং একে ভিন্ন ভিন্ন নামে আলাদা করতে পেরেছি। কিন্তু এই শ্রেণীবিভাগ বা বিশেষীকরণটা আবার দোধারি তলোয়ারের মতো। কারণ এটা আমাদেরকে একটি অসম্পূর্ণ কাঁচ বা প্রিজমের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে দেখায়। যার ফলে আমরা দেখি দুনিয়ার জ্ঞান সব নানা ভাগে বিভক্ত। আমরা সামগ্রিক চিত্রটাকে খুব কমই অনুধাবন করি।

আমাদের একটা জিনিস বুঝতে হবে যে এই বিভাজন যা আমরা বিশ্বকে বুঝতে তৈরি করেছি এবং যা কিছু এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছি, তা কেবল আমাদের মনমস্তিষ্কে এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান।

বিচার্ড ফাইনম্যান এ সম্পর্কে দারুণ কথা বলেছেন, “যদি আমাদের এই ছোট্ট মন, কিছু সুবিধার জন্য, এই মহাবিশ্বকে নানা ভাগে ভাগ করে-যেমন, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি-তবে, মনে রাখবেন প্রকৃতি কিন্তু তা জানে না!”

Book-72-100 Mental Models by Wisdom Theory pic 10 Saphollo Prokasoni
মানসিক ধ্যানধারণার ছক

দুনিয়া হলো পুরো একটা সামগ্রিক ব্যাপার। তাই এটাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হবে। অর্থাৎ আমরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার জন্য যে লেবেলগুলো ব্যবহার করি তা তো দুনিয়ার প্রতিটি দিক বুঝতে আমাদের সাহায্য করার জন্য। কিন্তু একই সাথে এটা আমাদেরকে বাস্তবতা থেকেও দূরে নিয়ে যেতে পারে। পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে আজকের যুগে যেখানে অনেক শ্রেণীবিভাগ বিদ্যমান সেখানে আমরা যে জগতে বাস করি সেটাকে বুঝতে এর একটা অবিচ্ছেদ্য দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আবশ্যক। এটা যেমন আছে তা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হওয়ার জন্য আমাদেরকে একটি বিশ্বব্যাপী পদ্ধতির প্রয়োজন। এ পদ্ধতি আমাদেরকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং তাই, আমাদের আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচুর পরিমাণে জ্ঞান জমেছে আমাদের জ্ঞান ভাণ্ডারে। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে জ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট শাখায় বিশেষজ্ঞ হতে বাধ্য করেছে। কিন্তু সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার একমাত্র উপায় হলো জ্ঞানের কেবল একটি নির্দিষ্ট শাখায় বিশেষজ্ঞ হওয়া-এই বিশ্বাস সামগ্রিক বিশ্বকে দেখার ধারণাকে উপেক্ষা করে।

একটি নির্দিষ্ট শাখায় বিশেষজ্ঞ হওয়ার আইডিয়াটা বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এ আইডিয়া মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই পরিচিতি লাভ করেছে। শিল্প বিপ্লবের সময় যখন কাজকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং সমাজের মধ্যে নানা স্তর সৃষ্টি হয়, তখন থেকেই এর সূচনা। ধ্রুপদী সময় থেকে, আজ থেকে ২ হাজার বছর আগে, পুরো ধারণাটা ছিল বিপরীত: তখন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি প্রকৃতি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পেতে জ্ঞানের নানা শাখায় বিচরণ করত। এই আইডিয়া কয়েক শতাব্দী ধরে প্রাধান্য পেয়েছে। এরিস্টটল থেকে উলফগ্যাং ভন গোথে পর্যন্ত এই ধারণা জনপ্রিয় ছিল।

এখন এটাও সত্য যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করার ফলে আমরা অগ্রগতি করতে পারছি। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য যে আমরা বিশ্বের একটা সামগ্রিক ছবি ধরতে পারলে এটা আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের ব্যাপারটাও উন্নত করবে। আমরা যে বিশ্বে বসবাস করি একে আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রতিটি তত্ত্ব এবং আইডিয়া বোঝার পাশাপাশি এগুলোকে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত করাও শিখতে হবে। এতে করে আমাদের বুঝজ্ঞান বৃদ্ধি পাবে।

এজন্য, কোন ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আমরা কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, এর পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও ধরতে পারব। এতে করে আমরা বিজ্ঞানের মহান সব আইডিয়া থেকে জ্ঞান নিয়ে আমাদের বাস্তবিক জীবনে কাজে লাগাতে সক্ষম হবো।

এসব মহান আইডিয়াকে মেন্টাল মডেলস তথা মানসিক ধ্যানধারণার নকশা বা ছক বলে। এই শব্দাবলি জনপ্রিয় করেছেন চার্লস টমাস মাঙ্গার। তার মতে, এসব মানসিক ধ্যানধারণার ছক ভালোভাবে বুঝতে এগুলো আমাদেরকে আরও ভালো এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “এসব মানসিক ধ্যানধারণার ছকগুলো থেকে তোমার পছন্দের কয়েকটি মেন্টাল মডেল নিয়ে এমনভাবে কাজ করে যাতে করে এগুলো তোমার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়।” তিনি নিজেও এসব ধ্যানধারণার ছককে নিজের অভ্যাসে পরিণত করেছেন এবং কয়েক যুগ ধরে অসাধারণ সব সিদ্ধান্ত নিতে এগুলোর সাহায্য নিয়েছেন। এতে করে তিনি গত শতাব্দীর সবচেয়ে অসাধারণ ব্যক্তিদের একজন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

মাঙ্গার এই আইডিয়াগুলোর প্রতি এতটাই আস্থাশীল যে তিনি বলেন যদি তিনি তরুণ হতেন তবে এসব বিষয় নিয়ে তিনি একটা কোর্স বানাতেন, যাতে সবাই সেখান থেকে শিখতে পারে।

এই কোর্স এবং রচনা চার্লস টমাস মাঙ্গারের সেই আইডিয়াকে অনুসরণ করেই তৈরি করা।

Leave a Reply