You are currently viewing আর্শীবাদ
Galpesalpe Kichukkan by Atonu Das Gupta, Published by Saphollo Prokasoni

আর্শীবাদ

আজকের বিকেলটা অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আলাদা। চায়ের কাপে হালকা চুমুক দিতেই অমূল্যের মনে পড়ে যাচ্ছে জীবন কতটা পালটে গেছে! এখন ফোনের বদৌলতে  সবকিছু যেন এক মুঠোয় চলে এসেছে! দূরত্বকে এখন অভিশাপ না ভেবে অন্য কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে! তখন দূরত্বকে মনে হত কবে যাবে আর এখন মনে হয়, ” বাহ্! বেশ ছিল দিনগুলো”।

সাল ১৯৯২ – প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষার পর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় কদমতলী সরকারি স্কুলে বেশ সোরগোল পড়ে গিয়েছিল ও-ই বছর। আর এতে জড়িয়ে পড়েছিলেন আশুতোষ বাবু – অমূল্যের জন্মদাতা।

মহাবিজ্ঞানী নিউটনের গতিবিদ্যার সূত্রের ব্যাখ্যার শেষের দিকে ঘন্টা বেজে গিয়ে শেষ হল আজকের পদার্থ বিজ্ঞানের ক্লাসের।  চক, ডাস্টার সহ আনুষঙ্গিক সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন আশুতোষ  বাবু। ক্লাসের প্রথম সারির দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে থাকা অমূল্যর মনে কয়েকটা প্রশ্ন উকি দিচ্ছে। আশুতোষ বাবুর ছোট ছেলে অমূল্য।  ক্লাসের ভেতরে ‘স্যার’ বলেই সম্বোধন করে বাবাকে কিন্তু ক্লাসের দরজার বাইরে গিয়ে ওটা হয়ে যায় ‘বাবা’।

এ বড় অদ্ভুত দৃশ্য।  ক্লাসের বাকি ছেলে- মেয়েরা বেশ মজা পায় এটা দেখে। আর আরেকটা ব্যাপার হলো, উনি ক্লাসে প্রশ্ন করা শুরু করলে নিজের ছেলেকে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন – নিজস্ব নিয়ম ছিল।  তাঁর দূরুহ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দেওয়া অসাধ্য সাধন করার মতো। যদিও পরীক্ষার ব্যাপারে তিনি ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে।

আশুতোষ বাবুর কাছে পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়াও উচ্চতর গণিতের  ক্লাসেরও দায়িত্ব অর্পণ করেছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ।

টিফিনের খাবার খেতে অমূল্য চলে যেত বাবার কেবিনে। বাকি ছেলেরা যখন টিফিনের লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কেনে তখন অমূল্যর দুপুরের খাবার সেরে নিয়ে কেবিনের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখে আর মনে মনে ভাবে, একটা সময় ছিলো যখন বাসা থেকে আমার জন্য খাবার আসতো না আর কোন বন্ধু লাইনে দাঁড়িয়ে ওর জন্য খাবার কিনতো। অমূল্যের টিফিন বাসা থেকে না এলে ওর জন্য খাবার কিনতো অভি। ক্যান্টিনের জায়গাটা আরও একটু বড় হলে ভালো হত। মাত্র দু’লাইনে দাঁড়িয়ে ওরা বেশ কষ্ট করেই কিনছে। অবশ্য ওখানে একটা বাদাম গাছ থাকায় রোদ-বৃষ্টির কষ্ট কিছুটা  হলেও লাঘব হয়। পেছনের দিকে খুব কাছাকাছির মধ্যে ম্যাডামদের কমন রুম। সেটার ঠিক পেছন দিক কিছুটা এগিয়ে গিয়েই বাবার রুম বা অমূল্যর টিফিনের ঘর। বাবার রুমের দরজার সামনেই দাড়াঁলেই হেড টিচারের রুমের পেছনের জানালা দেখা যায়। যতটুকু বোঝা যায়, হেড স্যার ওনার চেয়ারে বসে আছেন। স্বভাবতই জানালা বন্ধ, ভেতরে এসি চলছে। পুরো স্কুলে এই একটি রুমই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত! আর অমূল্যর বাবার রুমে এসি নেই কিন্তু রুমটা এমনিতেই ঠান্ডা থাকে। বাইরে হয়তো রোদে খা খা করছে কিন্তু একবার রুমে ঢুকে বসতেই সব তাপ- ভাপের নিমেশেই উপশম!

আজকের দুপুরের খাবারে ছিল ভাত, ডাল, তিত করলা ভাজি, কোরাল মাছের তরকারি  আর লেবু। যাওয়ার সময়ই ও সাথে করে পরের পিরিয়ডের বই নিয়ে যায় – আজকে সাথে নিয়ে এসেছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের নোট খাতা। কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছিল মাথায় সেগুলো বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

আশুতোষ বাবু দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার বা প্রাক নির্বাচনী ( প্রি- টেস্ট)  পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রুটিন তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। পাশাপাশি দশম শ্রেণীর উচ্চতর গণিতের  প্রশ্ন করার  দায়িত্বও তার। এটা অবশ্য সবসময়ই তার বাধা রুটিনের কাজ। এছাড়া মাধ্যমিক পরীক্ষার বহিঃ পরিদর্শক হিসেবে পদার্থ বিজ্ঞান এবং উচ্চতর গণিতের পরীক্ষাও তিনিই নিয়ে থাকেন।  নিয়মিত সকালে উঠে ঘড়ি ধরে হাঁটতে যাওয়ার অভ্যাস থাকায় আজকেও তার অন্যথা হয়নি।  তারপর বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া সেরে গন্তব্যস্হলে রওয়ানা হয়েছেন। দুপুরে পিওন যায় বাসা থেকে খাবার আনতে বাপ-ছেলের জন্য। মোবারক আলী বা সুবল চন্দ।  মোবারক অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনা-নেওয়া, ঘন্টা বাজানো, ক্লাসরুমের তদারকিও করে সে। সুবল ক্যান্টিনের দায়িত্ব সামলাতে ব্যস্ত থাকে, ছোট ভাইও কাজ করে একসাথে – সাধন। বাথরুম আর ময়লা পরিষ্কার আরফান মিয়ার এখতিয়ারে পড়ে।  তার ভাইয়ের ছেলে স্কুলে পড়ার পাশাপাশি  তাকে এসব কাজে সাহায্য করে।

বাসায় ফিরে সন্ধ্যার সময় চায়ে ডুবানো বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,” আজকে বাবার কাগজপত্রের মধ্যে প্রি টেস্ট পরীক্ষার পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র দেখতে পেলাম!” আর ওইসময় ওর বাবার সাথে কথোপকথন চলছিল অফিসের পিয়ন মোবারকের।  যদিও সে পান আর সিগারেট খাওয়ার জন্য টাকা চাইছিল। নানা দুঃখসুখের কথাও বলেছিল যা সে বাবার কাছে প্রায় সময়ই বলে। বয়স ৩৫-৪০ এর মধ্যে হবে। পরনে একটা কালো প্যান্ট আর নীল রংয়ের চেক শার্ট যেটা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। চুনের দাগ লেগেছে  কালো প্যান্টের অনেক জায়গায়!  প্রায় সময়ই পান চিবোতে থাকলেও আজকে আর সে কাজ করছে না। ওর ক্লাসের সময় হওয়ায়  ক্লাসরুমে চলে গিয়েছিল অমূল্য। মোবারকের চোখের চাহনি কেমন যেন অস্বাভাবিক লেগেছিল।

ক্লাসের শেষে অভি এসে বললো ও অমূল্যের খোঁজে গিয়েছিল ওর বাবার রুমে কিন্তু ওখানে কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে এসেছে।  নোট খাতাটা দরকার ছিল ওর। আর ফিরে আসার সময় অভি মজুমদার স্যারকে ওই রুমে ঢুকতে দেখেছিল। হয়তো কোন দরকারে গিয়েছিলেন ওখানে।  এমনটা প্রায়ই স্যার বা ম্যাডামরা ওর বাবার রুমে যান।

তাহলে কি দরজা খোলা রেখেই কোথাও চলে গিয়েছিলেন আশুতোষ বাবু ? না, এমন তো হওয়ার কথা না।

যাক গে, আজকে রাতে জিজ্ঞেস করে নেবে এমনটাই ভেবে নিল ও।

সন্ধ্যায় পড়তে বসে পড়ার রুটিনে চেঞ্জ করার কথা ভাবছে পরীক্ষার আগে। ঢিমেতালে পড়ালেখা অনেক হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কপাল পুড়বে কোন সন্দেহ নেই! কিছু বিষয়ের উপর সময় বাড়াতে হবে – গণিতের, দুটোই – সাধারণ গণিত আর উচ্চতর গণিত। রসায়ন, ওদিকে বাংলা দ্বিতীয় পত্র। বাংলা ব্যাকরণের খুটিনাটির ব্যাপারটা কেমন জানি লাগে?  সবকিছুই গুবলেট পাকিয়ে যায়। আর ওদিকে আবার সামাজিক বিজ্ঞানেও সমস্যা রয়েছে যেটা গুছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। রুটিনের পেছনে পুরো সময়ই আবার দেওয়া যাবে না। পড়া শেষের দিকে বসতে হবে রুটিন নিয়ে।

যথারীতি আজকের পড়াও শুরু করলো বাংলা দ্বিতীয় পত্র দিয়েই! ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধানের নিয়মাবলি পড়তে হবে। সন্ধি বিচ্ছেদেও সমস্যা রয়েই গেছে। এত পড়ালেখার মারপ্যাচে বাবার সাথে আর কথা হলো কই?

পরের দিন সকালে উঠে রেডি হয়ে স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে কলাবাগানের মোড় পার হওয়ার পর এক বনরুটিওয়ালা বিক্রেতাকে ভ্যান চালিয়ে যেতে দেখলো। কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে নিজে নিজেই বলে উঠলো, ” আরে, এটা সাইফুল না?? ও আবার কবে থেকে ভ্যান চালানো শুরু করেছে?”  ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ওর সাথে হাতাহাতি হয়েছিল। এরপর থেকে ওকে আর ওভাবে মনে পড়ে না।

আশুতোষ বাবুর আজকে পদার্থ বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস আছে। ব্যবহারিক ক্লাসের বিল্ডিং আলাদা – দ্বিতল ভবনের নিচের তলায় রসায়ন পিরিয়ডের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আর উপরের তলায় প্রথম ক্লাসে পদার্থ বিজ্ঞান আর দ্বিতীয়টিতে জীববিজ্ঞানের ক্লাস হয়।  সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় লক্ষ্য করে দেখলেন, গতকাল আরফান মিয়াকে এদিকটায় ঝাড়ু দেওয়ার কথা বললেও পরিষ্কার করতে ভুলে গেছে। ক্লাসের জন্য  যন্ত্রপাতি জোগাড় করে ফিরবার পথে আবার ওকে বলতে হবে। ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষকের জন্য আলাদা একটা ডায়াস আছে যেখান থেকে দাঁড়িয়ে ক্লাস নেওয়ার কথা!

সকালে রুমে গিয়ে ভালোভাবে দেখে নিচ্ছেন ব্যবহারিক ক্লাসের যন্ত্রপাতি।  সিলভার রঙের আলমারিতে সব জিনিসপত্র রাখা আছে যেগুলো তিনি শহর থেকে কিনে আনেন। বছরের পর বছর আগলে রাখার সুবাদে এগুলোও খুব কাছের জিনিস হয়ে গেছে তার। প্রতি ক্লাসে মাথাপিছু পনের থেকে বিশ জন ছাত্র থাকে। ক্লাসের বিষয় – সরল দোলকের সূত্র।  বিশজনের গ্রুপ হলে চার দলে ভাগে করতে হবে। তাই ওদের জন্য সব যন্ত্রপাতি জোগাড় করে রাখছেন। ক্লাসে প্রবেশের সাথে সাথেই যাতে করে সবকিছু প্রস্তুত থাকে।

আজকের ক্লাসে একটা মজার ঘটনা ঘটলো। নবম শ্রেণির   রসায়ন পিরিয়ডে পড়া কেউই তেমন ভাবে বলতে পারলো না। ম্যাম এমনিতেই অনেক রাগী। আর আজকে রাগের ষোলকলা পূর্ণ হলো! কারণ গত সপ্তাহের ক্লাসে পর্যায় সারণী খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আর এ সপ্তাহে পড়া নেওয়ার কথা ছিল।  একে একে রোল নাম্বার এক থেকে পনের পর্যন্ত সবাইকে ক্লাসের বাইরে বের করে মাঠে দাঁড় করিয়ে দিলেন। কারও তেমন কোন সমস্যা না হলেও অমূল্যের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে!  যে কোন সময় বাবার চোখে পড়ে গেলে  বারোটা বেজে ষোলটায় গিয়ে ঠেকবে। একে কাঠফাটা রোদের মধ্যে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটাও আরেক ধকল!

“কোথায় যে এসে পড়লাম। আজকে বাসা ঢেকে বেরুনোর সময় একবার ভেবেছিলামও যে আজ না যাই। কেন যে এলাম”- মাঠে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলে যাচ্ছিল অমূল্য।

তবে জগদম্বার কৃপায় সে অপেক্ষা আর বেশিক্ষণ করতে হল না। কি ভেবে ম্যাডামের দয়া হলো আর উনি ভেতরে সবাইকে ডেকে নিলেন এক এক করে।

দেখতে দেখতে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। এবারের পরীক্ষায় পদার্থ বিজ্ঞানের পরীক্ষার পর বেশ সোরগোল পড়ে গেল। কি নিয়ে? হাসিব, চিন্ময়, রাজীব, রিপন, লিটন, অভি, জয়, মানস, অমিত – সবার মুখে মুখে পদার্থের অঘটন ঘটে যাওয়ার গল্প। তবে সব শুনে অমূল্যের মনে হলো ঘটনার মূল উৎস ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারছে। কে বা কারা প্রশ্ন পত্র ফাঁস করেছে। আর প্রশ্নপত্র বরাবরের মতো এবারও করেছিলেন আশুতোষ বাবু। কাজেই বিষয়টা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। অমূল্য বিষয়টা শুনেই আন্দাজ করে নিয়েছে এটা কার কূটকর্ম হতে পারে?  মোবারক!! ইচ্ছে হচ্ছে একেবারে যদি দল বেঁধে নিয়ে গিয়ে উত্তমমধ্যম দেওয়া যেত! তাহলে শয়তানের উচিত শিক্ষা হত। আজকে সন্ধ্যায় বাবাকে বিষয়টা জানাতে হবে।

ওইদিন সন্ধ্যায় চায়ের টেবিলে বসেছে। আশুতোষ বাবু চা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছেন আর সাথে মাঝেমধ্যে একটা করে টোস্ট বিস্কুটও চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছেন। অমূল্যের বিস্কুটটা মিষ্টি – সেভয়’স বিস্কুট! বেশ মজা। ইচ্ছে করে পুরো প্যাকেট এক বসাতেই সাবাড় করে নিতে।

অমূল্য – বাপি, কিছু কথা ছিল

আশুতোষ – হ্যাঁ, বলো বাবা.. কি বলবে?

অ – শুনলাম, এবার ফিজিক্স নিয়ে বেশ গন্ডগোল হচ্ছে।

আ- হ্যাঁ,  যা এত বছরে কখনও হয়নি, তাই হয়েছে।

অ – তুমি কিছু আঁচ করতে পারছো?

আ – হ্যাঁ, আন্দাজ করতে পারলেই কি সবসময় সব বলা যায়?

অ – মোবারক কি তাহলে পার পেয়ে যাবে? চুরি কিন্তু ও- ই করেছে!

আ – এতটা জানলে কি করে?

অ – ওর সবসময়ই দৃষ্টি থাকতো কোন কিছু হাতিয়ে নেওয়ায়! যতবারই দেখেছি মনে হত এই বুঝি তোমার অগোচরে কিছু একটা সরিয়ে নিলো।

আ – ও তোমার মনের ভুল!

অ- মানে?? ও ই তো চুরি করেছে!!

আ – হ্যাঁ কিন্তু গরীবের পেটে এভাবে লাথি মারলে কি করে হবে?? তাও আবার আন্দাজে , শুধু অন্ধ অনুমানে ভর করে !

অ – তাহলে ওকে আজকে ছেড়ে দিলে কালকে আবার চুরি করবে।

আ – শাস্তি দিতে হবে।  তবে এমনভাবে যেন তা আর্শীবাদে রূপ নেয়!  ঠিক শাসনের খড়গের মতো যেন নির্মম না হয়। তুমি এসব বিষয় নিয়ে না ভেবে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হলেই ভাল হয়। সামনেই তো টেস্ট পরীক্ষা। সময় কিন্তু বেশি পাবে না।

অ – না, ক্লাসে গেলে সবাই শুধু এসব নিয়েই কথা বলছে প্রতিদিন! আর ভাল লাগে না। ভাবছি, স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিবো।

আ – তা কি করে হবে ? প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে তো সমস্যা হবে। অন্তত ওটা ঠিক রেখো। ওখানে যা দেখানো বা পড়ানো হচ্ছে ওটা পরে আবার হয়তো পরীক্ষার আগে দেখিয়ে দেবে।

অ – ব্যবহারিক পরীক্ষায় থাকে পঁচিশ নম্বর। বাকি তো রচনামুলক।

আ – বুঝলাম তো কিন্তু ওই নম্বর ছাড়া তো আশির বেশি নাম্বার আসবে না। লেটার মার্কস হচ্ছে না! কাজেই যা বলছি লক্ষ্য রেখো। ক্লাসে অনেকেই বহু কথা বলবে, ওদিকে মনোযোগ না দিয়ে পড়ায় মন রেখো।

“যথাআজ্ঞা পিতা” – কথাটা মনে মনে বলেই পড়ার ঘরে চলে গেল ও।

অভির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। একসাথে স্কুলে যাওয়া-আসা , টিফিন পিরিয়ডে মজা করে টিফিন করা। তখন প্রাণের কমিকস বইগুলো ভীষণ জনপ্রিয় ছিল – চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিঙ্কি, রমন, শ্রীমতী, অগ্নিপুত্র-অভয়, অরণ্যদেব – এই বইগুলো বলতেই অমূল্য পাগলপ্রায় ছিল। একটা কাল রঙের ব্রিফকেস ছিল, খুব সম্ভবত ওর বাবার। ওটা বইভর্তি করা ওর উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল আর সেই কাজে ওকে সহযোগিতা করেছিল অভি। বাজারে এই বইগুলো যে সংখ্যায় পাওয়া যেত, সেভাবে ওর বাসার আশেপাশে পাওয়া যেত না। ওদিক থেকে অভির এক ঢিলে দুই পাখি মারা হত – বই কেনাও হত আর পড়াও। ওরা দল বেঁধে স্কুল থেকে বাসায় ফিরতো আর বেড়াতেও আসতো মাঝেসাঝে। অভি হাসাতে পারতো বেশ । ওদের দুজনের বন্ধুত্ব সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণাই ছিল আশুতোষ বাবুর এবং তাঁর সহধর্মিণীর।

চার বছরের বন্ধুত্বে চিড় ধরেনি কখনো। একসঙ্গে স্কুলে যাতায়াত থেকে শুরু করে টিফিনবাক্সের খাবার লেনদেন, পড়াশোনার নোটপত্রেরও আদান-প্রদান, স্কুলের মাঠে একসাথে ঘুরে বেড়ানো, ভাঙ্গা বেঞ্চের পায়া আর টেনিস বল মাঠে নিয়ে গিয়ে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা। আবার পূজোর সময়ে অভির কলোনীতে অমূল্যের বেড়াতে যাওয়া – এসব লেগেই থাকতো সবসময়।

এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ফলাফল তেমন একটা জানা গেল না শেষ পর্যন্ত! সব আগে যা ছিল তেমনই রয়ে গেল। নির্বাচনী পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে সবাই ভীষণ ব্যস্ত। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে সবাই যেমন সপ্তাহ দুয়েক বেশ ব্যস্ত ছিল। পরে সব কেমন যেন মিইয়ে গেল। কেরানীরাও বহাল তবিয়তে আগের মতো যার যার কাজ করে যাচ্ছে! মোবারক বা সুবল দুজনেই আগের মতো আশুতোষ বাবুর কাছ থেকে পান – বিড়ির টাকা পাচ্ছে। আরফান মিয়ার ভাইয়ের ছেলের জন্য ঈদে নতুন জামাও করিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারগুলো সবার কাছে স্বাভাবিক ঠেকলেও অমূল্যের অস্বস্তি হতে লাগলো। একটা ব্যাপার ওকে বেশ হতবাক করলো – এত বড় ঘটনায় আশুতোষ বাবুর নিরবতা! ও নিরন্তর ভেবে যেতে লাগলো উনি নিরব কেন? চাইলেই পারতেন বেয়ারাগুলোর সাজার ব্যবস্হা করতে বা আরও খোঁজ নিতে কে করলো এ দুরূহ কাজ। কিছুই করতে দেখা গেল না তাকে। এরপর ব্যবহারিক ক্লাসের দায়িত্ব থাকলেও পদার্থ বিজ্ঞান প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ স্বাভাবিকভাবেই উনি অন্য শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর  করলেন। পিতার এত বড়ো অপমান পুত্রের কাছে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। অমূল্যের কাছে এটা অপমানের হলেও আশুতোষ বাবুর কাজে কর্মে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। উনি বরাবরের মতোই নির্বিকার, ব্যবহারে অমায়িক। অগত্যা অমূল্যও চুপ হয়ে গেল আর পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

সময় ২ ঘন্টা। প্রথমে রচনামূলক প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে এরপর নৈব্যক্তিক। পরীক্ষার প্রশ্ন হাতে পেলে হাত ঠান্ডা হয়ে আসার অভ্যাসটা অনেক পুরনো। পরীক্ষা খুব একটা ভালোও নয় আবার খারাপও গোছের দিয়ে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আসার পথে পেছন থেকে ডাক পড়লো অভির।

অভি – কি খবর? কেমন হলো? ম্যাথগুলো পেরেছিলে??

অমূল্য – সবগুলো না, তবে বেশির ভাগই।  আর তোমার?

অভি – মোটামুটি বলা যায়!

অ – তো কি খবর? রসায়নের প্রস্তুতি কেমন?

অভি- এটার চেয়েও বাজে!

অ – আচ্ছা!  এবার সহজ হবে, চিন্তা করো না। তুমি চাইলে বাসায় আসতে পারো। আমি যেগুলো পড়ছি, তোমাকে বলে দিলাম।

অভি – দেখা যাক! সময় পেলে চলে আসবো। তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।

অ – হ্যাঁ, কি নিয়ে??

অভি – না বললে তো বুঝবে না। আর এখানে বলাও যাবে না। একটু নিরিবিলি না হলে বিপদ আছে!

অ – খুব জরুরি কিছু?? না হলে আপাতত বাদই দাও।  পরীক্ষার পরই বসা যাবে।  ২৩ তারিখ তো পরীক্ষা শেষ, পরদিন চলো দেখা করি। খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলে। দু’জনের বাসা থেকেই সমান দূরত্বে।

অভি – ভালো! ঠিক আছে।  ওইদিনই দেখা হোক।

 

তেইশ তারিখ বিকেলের দিকে দেখা করার সময় ঠিক করা হলো। সময় মতো চলে আসলো অভি।

অমূল্য –  পরীক্ষা কেমন হলো?

অভি – ফাইনাল তো দিচ্ছি। কাজেই খারাপ হোক, ভালো হোক, অত ভাবছি না।

অ – হ্যাঁ, কি কথা বলবে… বলো! মনে হচ্ছে,  বেশ গুরুগম্ভীর আলোচনা হতে চলেছে।

অভি – হ্যাঁ, ওইরকমই ধরে নাও।

অ- কি খবর?

অভি – প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে ঘটনা ঘটেছিল, তার জন্য দায়ী ছিলাম আমি!

অ – মানে??

অভি – হ্যাঁ, ওইদিন তোমার কাছে নোট আনতে গিয়ে রুমের ভেতরে  গিয়ে দেখি কেউ নেই। আমি ভাবলাম, তুমি যেখানটায় বসো, ওখানেই তোমার নোট খাতাটা থাকবে।খুব দরকার ছিল বলে এখন নিয়ে ক্লাসের পরেই তোমাকে দিলাম। কিন্তু ওইসময় টেবিলের উপরে দেখলাম, পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র! কিছু না ভেবেই ওটা ওখান থেকে একটা সরিয়ে ফেলি। টাকারও দরকার ছিল। জানতাম, ওটা থেকে বেশ ভালো দামই পাবো।

অ – আমার মাথায় আসছে না কিছুই।  টাকা লাগলে আমাদের বলতে, সবাই মিলে ব্যবস্হা করতাম!!

অভি – কেন? তুমি  আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানো না এখন! আমাদের মধ্যে ইদানীং দূরত্বের সুবাদে তুমি হয়তো কিছুই টের পাওনি। পাওয়ার কথাও না। আমি নেশা করছিলাম। এটার টাকা নিশ্চয়ই কোথাও থেকে জোগাড় হতো না।

অ- তারপরে কি হলো?

অভি- স্যার আমাকে দেখেছিলেন! কিভাবে তা আমার জানা নেই??  উনি ভালোভাবেই জানতেন, তোমার সাথে আমার সখ্যতার বিষয়টা। ওনার চিন্তা ছিল, আমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের ছেলের নামও জড়িয়ে পড়তে পারে। বলতে পারো, পুত্রকে এসবের মধ্যে না জড়ানোর জন্যই উনি সব দায় মেনে নিয়েছেন।

অ – তোমার সাথে বাবার এ ব্যাপারে কথা হয়নি??

অভি – হ্যাঁ, স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে সব বলেছেন।  আমার জন্য নেশা করার কথা বাবা- মা কে না জানিয়ে আপাতত নেশাগ্রস্তদের পূর্নবাসন কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।  এরপর থেকে আমি বিগত কয়েক মাসে আমি অনেকটা  পালটে গেছি। পরে আমার বাবাকেও সব খুলে বলেছেন।  বিষয়টা যত জটিল হতে পারতো, তা উনার কারণে হয়নি। এমন শিক্ষক, বাবা পাওয়া আসলেই দুষ্কর।  আর তোমাকেও কিছু জানাতে বারণ করেছিলেন অন্তত পরীক্ষা পর্যন্ত!  কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তোমার পরীক্ষার ফলাফলে অবনমন!  এটা নিয়েও উনি বেশ চিন্তিত ছিলেন।

অ – এত কিছু ঘটে গেল কিছুই টের পেলাম না! আমি অনেকবার ভেবেছিলাম, বাবাকে জিজ্ঞেস করবো কিন্তু সাহস হয়নি। মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম, মোবারক বা সুবলের মধ্যে কেউ নিয়েছে! যেহেতু এত বছরের মনিব- চাকর সম্পর্ক,  তাই বাবা চুপ করে গেছেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ঘটনার মূল উৎস থেকে আমি অনেক দূরে দাঁড়িয়ে।

অভি – মোট কথায়, স্যার আমাকে নতুন জীবনের আলো দেখিয়েছেন! আর সেই পথেই হাঁটতে শুরু করেছি। এ ঘটনা আমার জীবনের জন্য অনেক বড় আর্শীবাদ।

অ – আজকের দিনটা অনেক শুভকামনা বয়ে আনছে। খবর পেলাম, বড়দাদার অষ্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্কলারশিপ পেয়েছে। আর এদিকে তোমার খবরটা পেলাম। চলো পোস্ট অফিসের ওদিক থেকে ঘুরে আসি। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না যে তুমি হারানো পথ খুঁজে পেয়েছো।

 

নগরভবন হাসপাতালের জেনারেল কেবিন। সিট নাম্বার ৩০৫।

অমূল্য বেডের পাশে বসে আছে। অভির বাইক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। কাল কাজ থেকে ফেরার পথে। দুপুরে খেয়ে শোয়ার পর এখনও ঘুম থেকে উঠেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ খুলে অমূল্যকে দেখতে পেয়ে কিছুটা হতবাকই হয়ে গেল!

অভি – তুমি আবার কখন আসলে?

অমূল্য – এইতো আধ ঘন্টা আগে।  এখন কি অবস্থা? ব্যথা কেমন?

অভি – আছে। সারতে সপ্তাহ খানেক লাগবে।

অ- হলো কিভাবে? সাইড দিতে গিয়ে?

অভি – হ্যাঁ, হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে চলে আসলো সামনে। ওকে বাঁচাতে গিয়েই…

অ – ঠিক আছে! আমি পারলে কাল আবার আসবো। মৌমিতা কোথায়??

অভি – ও একটু বাসার দিকে গেছে। রান্নার কাজ সারতে। আজকে, কালকে ছুটি নিয়েছে।

অ – আচ্ছা, তাহলে ও আসা পর্যন্ত বসি, গল্প করি।  মাথার বালিশটা একটু সরিয়ে পেছনে দিলে বেশ হেলান দিয়ে বসতে পারতে।

অভি- না, ঠিক আছে এভাবেই! তুমি কাজ থেকে এখানে?

অ – মহিনের কাছ থেকে খবর পেলাম তোমার।

সুস্থ হয়ে উঠো, তারপর বেড়িয়ে আসা যাবে কোথাও থেকে।

অভি- আরে না! অত সহজ, ছুটি পেলে আর কি? এমনিতেই বেশ কিছুদিন তো কাজ কামাই হচ্ছে।

অ- ব্যাপার না! ও কোনভাবে ম্যানেজ হয়ে যাবে।

অভি – স্যার কেমন আছেন?

অ – আছেন মোটামুটি।  নিয়মিত চেক আপ, ব্যায়াম করে যাচ্ছেন। মা ও একইরকম।  দু’জনে একসাথেই ডাক্তার দেখান সময় করে। মাসি আর মেস কেমন আছেন?

অভি – চলে যাচ্ছে ওনাদেরও। বাবার তো ফার্মেসীতেই সারাদিন কেটে যায় আর মায়ের টিভি সেটের সামনে ইটিভি বাংলা দেখে।

গল্পে  গল্পে বেশ আরও কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর মৌমিতা রাতের খাবার নিয়ে ফিরে এলো। সেই সাথে অমূল্যও আজকের মতো চলে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে।

তথ্যসূত্র: গল্পেসল্পে কিছুক্ষণ। লেখক: অতনু দাশ গুপ্ত। ঢাকা, সাফল্য প্রকাশনী, ২০২২।

Atanu Das Gupta

Atanu Das Gupta is a writer, poet, playwright, columnist lives in Nova Scotia, Canada (atanu4321@gmail.com)

Leave a Reply